প্রথম বাংলাদেশী নারী রেফারি

পাহাড়কন্যা জয়া চাকমার অর্জন।

মাকসুদা আকতার তমা, ঢাবি | প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২০ ০৩:১১; আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৮:৩৩

ছবিঃ জয়া চাকমা
রাঙমাটির পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় জন্ম নেয়া সাহসী ও মেধাবী সেই জয়া চাকমা এখন ফিফা (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব  ফুটবল এসোসিয়েশন) এর প্রথম বাংলাদেশী নারী রেফারি। তিনি ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর ফিফার ৫ম নারী রেফারি হিসেবে যুক্ত হন। ২০২০ সালের ১জানুয়ারী থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছর তিনি মেয়েদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করবেন। সঞ্জীবন চাকমা ও মালতি চাকমার মেয়ে "জয়া মতি চাকমা" জন্মগ্রহণ করেন রাঙামাটি জেলায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন তিনি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন ইতিহাস বিভাগ থেকে। শিক্ষাজীবন শেষে বন্ধুরা যখন বিসিএস-ব্যাংক ইত্যাদির পেছনে ছুটে বেড়িয়েছেন জয়া তখন ছুটেছে স্বপ্ন পূরণের নেশায়।
 
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার ভীষণ ঝোঁক ছিল।  ছেলেবেলায় ১০০ মিটার-২০০ মিটার দৌঁড়ে বরাবরই তিনি ভালো করতেন। এছাড়াও শিশু একাডেমির প্রতিযোগিতায়ও একাধিকবার অংশ নিয়েছেন। একসময় হ্যান্ডবলও খেলতেন। তবে ফুটবলটাই ছিল জয়ার ধ্যানজ্ঞান। ২০০৬ সালে রাঙামাটিতে তিন মাসের একটা ফুটবল ক্যাম্প করেন। এরপর ঢাকায় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আন্তঃজেলা ফুটবলে অংশ নিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন করেন রাঙামাটিকে। এর পর পরই অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য জাতীয় দলে ডাক পান তিনি। ঘরোয়া ফুটবলের পাশাপাশি ইন্দো-বাংলা গেমস, এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বাছাই টুর্নামেন্ট ও ২০১০ এসএ গেমসে খেলেছেন তিনি। ২০১২ সালে দল থেকে বাদ পড়লে কিছুদিন বিজিএমসিতে চাকুরী করেন।
 
২০১০ সাল থেকেই তিনি রেফারিতে মনোনিবেশ করেন। ২০১২ সালে "বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের" মাধ্যমে তিনি রেফারিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও তাজিকিস্তানে একে একে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা পরিচালনার দায়িত্ব পান। আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে তিনি ২০১৯ পর্যন্ত টানা অন্তত ১০ বছর রেফারিং করেন। এরমধ্যে ২০১৫ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক ফুটবল উৎসবে ১০টি ম্যাচ পরিচালনা করেন। ২০১৯ সালে ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টের দুটি ম্যাচে রেফারিং করেন। ভারতের সুব্রত কাপে, নেপাল-ভুটান এমনকি এশিয়ার বাইরে ইউরোপে গিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন জয়া। লেভেল ৩, ২ ও ১ কোর্স শেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের রেফারি হন। তার নেতৃত্বে বিকেএসপির নারী ফুটবল দল ভারতে "সুব্রত মুখার্জি গোল্ডকাপ" চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিনি সেরা কোচের সম্মাননা পান। গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ফিফার নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা দিয়ে ফিফা রেফারি হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করেন। এরপর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে এক মেইল বার্তায় ফিফা তাকে আগামী এক বছরের জন্য রেফারি করার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
 
এর আগে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মাত্র চার জন নারী ফিফার রেফারি হওয়ার সম্মাননা অর্জন করেন যাদের ২ জন ভারতীয়, ১জন নেপালী,১ জন ভুটানের এবং সর্বশেষ ৫ম জন হিসেবেএই সম্মান পেলেন আমাদের ঘরের কন্যা। এর আগে ২০১৪ সালে শ্রীলংকায় ১৪তম ডিভিশনে তিনি রেফারি হিসেবে যোগ দেয়ার পরেই তার তিনি এক অন্যরকম স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করেন।কারণ তিনি ওই টুর্নামেন্টে ভারত ও ইরানের ফাইনাল ম্যাচটির রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে প্রথম বাংলাদেশী নারী ছিলেন যিনি বিদেশের মাটিতে রেফরিং এর গৌরব অর্জন করেন। তারই ফলাফল স্বরূপ ইতিহাসের পাতায় আজ তাঁর নাম লেখা হয়ে থাকবে।
তিনি বরাবরই ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও পরিশ্রমী। দেশের বাইরে গেলে অনেকই যখন অবাক হতো বাংলাদেশ থেকে এখনো কেউ ফিফার রেফারি হয় নি তখন থেকেই তিনি আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে শুরু করেন।এবং তিনি মনে করেন খেলাধুলাই তাকে "স্বাধীন, আত্নবিশ্বাসী ও সাবলম্বী " করে তুলেছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা একদিন বিশ্বজয় করবে।লাল-সবুজের পতাকা আরও একবার বিশ্বকে বিস্মিত করবে।
তার এই কর্মের মাধ্যমে তিনি একই সাথে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন উপজাতি মেয়ে তথা দেশের প্রতিটি মেয়ের কাছে।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top