খেলাধুলায় ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে নারীরা।

নারীকথন | প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২০ ২২:৩০; আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৩২

ছবিঃ ইন্টারনেট

রক্ষণশীল সমাজে চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে, নানা প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তারা। খেলার মাঠে তাদের হাতে ধরা লাল-সবুজের পতাকা এখন অনন্য উচ্চতায়। তাদের হাতেই রচিত হচ্ছে আমাদের সমৃদ্ধ ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস। 

নারীরা প্রথমে পরিবারেই খেলাধুলা বিষয়ে বাধা পান। সেই বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলে আসে আবার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধা। সাথে উপরি পাওনা সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন বৈষম্য। জাতীয় পর্যায়ে আসার পর নারীদের মুখোমুখি হতে হয় পৃষ্ঠপোষক সমস্যার। এইসব নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীদের।তবে এক দশকে এই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন নারী খেলোয়াড়েরা।

ছেলেদের আগেই দেশকে আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেয় নারী ক্রিকেটাররা। গত বছরের জুনে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ছয় জাতির এশিয়া কাপ ক্রিকেটে শক্তিশালী ভারতকে আরো ৩ উইকেটে পরাজিত করে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতান জাহানারা-সালমারা। এদিকে, ভারতে মেয়েদের আইপিএলে বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন জাহানারা আলম।ক্রিকেটে বাঙালি নারীদের উত্থানের গল্পটি হঠাৎকরেনয়, বরং এই পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালে। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের হয়ে ১৯৮৩ সালে দলনেতা আইভির নেতৃত্বাধীন দলটি ইডেন গার্ডেনসে পশ্চিমবাংলা নারী ক্রিকেট দলের বিপক্ষে ৩০ ওভারের একটি প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে ২০০০ সাল পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও এই খেলায় মেয়েদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়নি তেমন। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বাংলাদেশি নারীরা এরপর থেকেই যেন ভালো করে চিনতে শুরু করেছে ক্রিকেটের ব্যাট-বলকে। ২০০৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে মাত্র ৯ রানে অল আউট করে ১০ উইকেটের বিশাল জয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ নারী দলের পথচলা। এর পরের সবকিছুই যেন গল্প। বার বার সফলতা এসেছে সালমাদের হাত ধরে। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত অনেক মেয়েই আজ খেলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

গত এপ্রিল-মে মাসে বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলের গ্রুপের ম্যাচে আরব আমিরাত ও কিরগিজস্তানকে পরাজিত করে সেমিফাইনালের টিকিট পায় স্বপ্ন-কৃষ্ণারা। সেমিতে মঙ্গোলিয়াকে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে উঠে আসে তারা। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ের ঘন্টাখানেক আগে ঘূর্ণিঝড় ফণী এসে ভন্ডুল করে দেয় ফাইনালের মঞ্চ। তাতে লাওসের সঙ্গে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশকে। বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ নারী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো এক গোল করে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার তালিকায় ঠাঁই করে নেন বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলার মনিকা চাকমা। এছাড়া সাতক্ষীরার ফুটবলার সাবিনা খাতুন বিদেশি কোটায় ভারতে ও মালদ্বীপের ক্লাবে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন।২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ দলের টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরে একদল কিশোরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে শুরু হয় হৈচৈ। দেশের প্রত্যন্ত কালসিন্দুরের মতো এলাকায় বেড়ে উঠেছে এই কিশোরী দলটি।

শুধু ফুটবল আর ক্রিকেটে নয়, গর্ব করার মতো আমাদের আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদ রয়েছেন, যারা দেশের জন্য বিরল সন্মাননা বয়ে এনেছেন। টেবিল টেনিসের বিস্ময়, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ জোবেরা রহমান লিনু। ১৬ বার জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে যিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠিয়েছেন। সাঁতারেও পিছিয়ে নেই মেয়েরা। এসএ গেমসে দুটি সোনা জিতে সাড়া ফেলেছেন মাহফুজা আক্তার শিলা। নৌবাহিনীর এই সাঁতারু ১০০ ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে জিতে নেন এ সোনা। বুদ্ধির খেলা দাবায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার শামীমা আক্তার লিজা। তিনি বাংলাদেশ মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হন। এছাড়া তিনি প্রথম বাংলাদেশি মহিলা দাবাড়ু হিসেবে বিশ্ব মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ৪০তম আসরের দ্রুততম মানবী হয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিরিন। তিনি টানা চারবারের মতো দেশসেরা দ্রুততম মানবী হয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশি নারীদের জয়যাত্রায় এসব নারী পথিকৃৎহয়েথাকবেন।

সবমিলিয়ে সময়টাযাচ্ছে নারী ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ভীষণ উদ্দীপক। ইতিবাচক হাওয়ার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে সেখানে। তবে এখনও যেতে হবে বহু দূর। নিশ্চিত করতে হবে যেন নারী ও পুরুষ অ্যাথলেটদের মধ্যে যেন কোনো বেতন বৈষম্য না থাকে। সুযোগ-সুবিধার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনকে নারীর জন্য সর্বোচ্চ নিরাপদ করে গড়ে তুলতে হবে।

যদিও উন্নতিতে উৎসাহিতহওয়ারমতোঅনেককারণইরয়েছে, তবুও রয়ে গেছে একটা বিরাট ও কঠিন প্রশ্ন। বর্তমানে ক্রীড়াঙ্গনে যে কাঠামো ও পদ্ধতি বিদ্যমান, সেখানে কি নারীরা খেলাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হন এবং খেলার মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্ন-লক্ষ্য পূরণ করার যথেষ্ট নিশ্চয়তা পান? গেল ১০ বছরের চিত্র থেকে দেখা যায়, প্রায় সকল ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের উদ্যমে, প্রতিভায় ও প্রচেষ্টায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন। বিদ্যমান কাঠামোর ভূমিকা সেখানে উল্লেখ করার মতো কিছু নয় এবং বিগত দশকগুলোতে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল তার অনেকগুলো এখনও নারীদের বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। অ্যাথলেটদের উপরে যৌন নিপীড়নের ঘটনা এখনও শঙ্কিত করে তোলে এবং নারী ক্রীড়াঙ্গনের জন্য সামগ্রিক উন্নয়নের পথে এটি বরাবরই অন্তরায় হয় আছে। এসবের মাঝে ইতিবাচক বিষয় হলো, নারী ক্রীড়াবিদরা, বিশেষ করে ক্রিকেটাররা সম্প্রতি তাদের বেতন বৈষম্য নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, নিজেদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

লেখাঃ আয়শা আকতার সুমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top