27

12/06/2021 নারীদের মূল্য আসলে কতটুকু?

নারীদের মূল্য আসলে কতটুকু?

নারীকথন

৮ অক্টোবর ২০২০ ২২:২৯

 
রাস্তাঘাটে চলতে গেলে আমরা প্রায়ই দেখি ফুটপাথে ময়লা পোশাকে উশকোখুশকো চুলে কিছু মহিলা বসে আছেন। প্রচলিত ভাষায় এদের আমরা বলি 'পাগলী'। সত্য কথা যেটা, পথে এদের দেখলে আমি একপ্রকার এভয়েডই করে যাই অস্বীকার করবো না। অন্য যেসব গৃহহীন বা ভিক্ষুক দেখি যেমন অন্ধ বা হাত পা নেই এদের কে ভিক্ষা দেয়া হয় করুণাবশত কিন্তু কখনো এইসব পাগলীদের সাহায্য করার চিন্তা বা ইচ্ছা কোনটাই আসেনি।
 
রাস্তাঘাটে থাকা এইসব পাগলীদেরকেই 'কে' বা 'কারা' যেন গর্ভবতী করে রেখে যায়। ঢাকা মেডিকেলের গাইনী ডিপার্টমেন্টে প্রতি এডমিশনেই এরকম একজন গর্ভবতী 'পাগলী' থাকেন। এদের কে বা কারা হাসপাতালে আনেন জানা যায়না। হয়তোবা কোন রিকশাওয়ালা, দোকানদার বা সহৃদয়বান ব্যক্তি। হাসপাতালের এমারজেন্সীতে ফেলে যায়, খালা বা দাদুরা ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে আসেন।
 
বাচ্চা হতে পারে সিজার অথবা নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে। এখন যেকোন সরকারি হাসপাতালে সব ধরণের অপারেশন ফ্রি, শুধু ঔষধগুলো রোগীকে কিনে আনতে হয়। কিছু ঔষধ আবার সরকারিভাবেই হাসপাতালে সাপ্লাই দেয়া থাকে, ওগুলো কিনতে হয়না। পাগলীর যদি সিজার করতে হয় তাহলে দেখা যায় এই ঔষধগুলা ডিউটি ডাক্তাররাই টাকা তুলে নিয়ে আসে। নরমাল ডেলিভারি করাতে হলে সে আরেক হুলস্থূল কাণ্ড। মানসিক ভারসাম্য না থাকায় প্রচণ্ড লেবার পেইনে থাকায় তাকে বিছানায় ধরে রাখাই দায়। ডেলিভারি করানোর সময়ও সে ননকোঅপারেটিভ, রীতিমত যুদ্ধ বেধে যায় তখন। অথচ সন্তান জন্ম দেয়ার পরে এই মানসিক ভারসাম্যহীন পাগলীও সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করে, স্তন্যপান করায়। মাতৃত্বের কাছে অন্য সবকিছু পরাজিত হয়। সন্তান নিয়ে পাগলীকে ফেরত যেতে হয় ওই ফুটপাথেই। কন্যা সন্তান হলে চিন্তা করি সে কি নিরাপদ ওই ফুটপাতে? তার মা যেখানে রক্ষা পায়নি সে কিভাবে পাবে? মাথায় এইসব চিন্তা ভীড় করলেও সরিয়ে দিতে হয়, ডাক্তারদের ইমোশনাল হতে নেই।
 
আরেক ধরণের কমন যে রোগী পাই সেগুলো হলো 'Postcoital tear' এর। মানে হলো স্বামীর সাথে সহবাসের সময় যোনিপথ ছিঁড়ে গেছে। এদের বেশিরভাগই আবার 'Child bride' অর্থাৎ বয়স ১৪-১৬ বছরের মধ্যে(দেশে এখনো বাল্যবিবাহ কি ব্যাপক হারে প্রকট সেটা গাইনীতে না আসলে আমি কল্পনাও করতে পারতাম না)। মেয়ের হাতে তখনো বিয়ের টাটকা মেহেদি, আর এদিকে ওটি টেবিলে শুয়ে কাতরাচ্ছে। এদের কে আবার নিয়ে আসে মা অথবা শ্বাশুড়ি, স্বামী নাকি সাথে আসতে 'লজ্জা' পায়। এই লজ্জা আন্ডারএজ স্ত্রীকে আঘাত করার নয়, সে যে বিছানায় ঠিকমতো কর্ম সম্পাদন করতে পারেননি সেই 'লজ্জা'। এখন একটু চিন্তা করে দেখেন দেশে মেয়েদের অবস্থান কোথায়।
 
রেইপের কথা বাদ ই দিলাম। বিবাহের পর এইদেশের মেয়েদের উপর সেক্সের নামে যেটা হয় সেটা টর্চার ছাড়া আর কিছু না। একবার এক রোগী পেলাম। বয়স ৪০ মত, পাঁচ সন্তান জন্ম দিয়ে এখন ষষ্ঠ সন্তান জন্ম দিতে আসছেন। জামাই নামের পাষন্ডকে ধরলাম যে পাইসেন ডা কি। জামাই বলে স্যার ভুল হয়ে গেসে। ২৫-৩০ বছরের অধিকাংশ মহিলা ৩য়/৪র্থ সন্তান ডেলিভারি করাতে আসে। শরীরে কিছু নাই একেকজনের, ম্যালনারিশড আর রক্তশূন্য হয়ে কংকালসার। কি নারকীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয় ডেলিভারি করাতে তা মায়েরা জানেন আর ডাক্তাররা জানেন। তাও স্বামীর চাহিদা পূরণ থেকে রেহাই নাই। এদের যখন জিজ্ঞাসা করবেন জন্মনিয়ন্ত্রণে কি পদ্ধতি নেন ৯০ ভাগ বলবে OCP খায়। স্বামীকে জীবনেও কন্ডম পড়াতে পারবেন না, ওতে নাকি তাদের সুখে ব্যাঘাত ঘটে। দীর্ঘসময় OCP ব্যবহারের ফলে বিস্তর শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু স্বামী বাবাজীদের তাতে টনক নড়বে না, তাদের যৌন সুখ পেলেই চলবে।
 
গাইনীতে মাস দুয়েক ডিউটির পর মানবজাতি না হোক অন্তত বাঙালি জাতির উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে। আমরা শহরে থাকি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ গুঁজে থাকি বলে কল্পনাও করতে পারবোনা গ্রাম আর মফস্বলে নারীর কি সামাজিক অবস্থান। হয় ভোগের বস্তু অথবা বাচ্চা তৈরি করার মেশিন, এর বাইরে আর কোন পরিচয় নেই।
 
লেখাঃ জেরিন শিকদার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাকসুদা আক্তার তমা
যোগাযোগ: এনিমা ভিস্তা, বি-৬ (৬ষ্ঠ তলা) , ৩০ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০
মোবাইল: ০১৮১১৫১৫৫৬৫
ইমেইল: [email protected]