চোরের সিঁদ কাটার জন্যই সিদল নামকরণ।

নারীকথন | প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর ২০২০ ০২:৩৫; আপডেট: ৮ অক্টোবর ২০২০ ০২:৪৭

ছবিঃ ইন্টারনেট

সিদল একটি দেশীয় কৃষিজাত পন্য। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম , লালমনিরহাট, ,নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় জেলার জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার সিদল। সিদল কী? সিদল আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আঞ্চলিক খাদ্যদ্রব্যের একটি। সিদলে প্রচুর আমিষ, খনিজ এবং ভিটামিন-এ আছে। কেন এই নাম?? চোরের মত সিঁদ কেটে বা গর্ত করে মাটির পাতিল বা মটকাগুলো রাখার জন্য সিঁধ থেকে সিদল নামটি এসেছে। অনেকের কাছেই নামটি একদম নতুন,বা অনেকেই শুনেছেন। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম সিদল পাওয়া যায়। তাই এক কথায় বলা যায় না আসলে সিদল জিনিসটা কী। তবে নিচে উল্লিখিত দুই অঞ্চলের সিদল বেশি জনপ্রিয়।

১.উত্তরাঞ্চলের সিদলঃ ছোট মাছ ভালো করে ধুয়ে রোদে মচমচে করে শুকিয়ে হামানদিস্তা, পাটা, ঢেকি, ঘাইল, ছিয়ায় মিহি গুড়ো করে চেলে নেয়া হয়। পরে কচুর ডাঁটা ধুঁয়ে, ছিলে ২/৩ ঘন্টা রোদে রেখে, পানি শুকিয়ে মিহি পেষ্ট তৈরী করা হয়। শুটকির গুড়ো, কচুর ডাঁটার মন্ড এক সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। এই পদ্ধতিটিই আসলে সিদল বানানোর আসল ও আদি পদ্ধতি। তবে এখন তাতে পেঁয়াজবাটা, হলুদ, মরিচ, ধনে, আদা, রসুন বাটা, তেল, লবণ সব কিছু ভালো করে মিশিয়ে হাতের তালুতে মন্ড নিয়ে টিকিয়া আকারে গড়ে ৩/৪ দিন কড়া রোদে শুকিয়ে শুকনো পাতিলে ছাই দিয়ে সংরক্ষন করা হয়।

২.সিলেটি সিদলঃ এক্ষেত্রে পুঁটি, ফাইস্যা বা যে কোন ছোট মাছ ভালো করে পরিস্কার করে ধুয়ে ৭/১০ দিন রোদে শুকিয়ে নেয়। মাটির বড় হাঁড়ি, কলসি, মটকার ভেতর বাইরে মাছের তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নেয়া হয়। শুকানো মাছ বড় ঝুড়ি, টুকরিতে নিয়ে একবার ধুয়ে সারা রাত পানি ঝরানোর জন্য রেখে, সকালে সে মাছ মাটির পাত্রে ভালো করে বিছিয়ে ভরে নেয়। ঠেসে ঠেসে ভরা হয়, যাতে ভেতরে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। মাছ ভরার পর মটকার মুখে কলাপাতা, তেঁতুল পাতা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দেয়া হয়, সাথে কাঁদা মাটি দিয়ে লেপে দেয়া হয়- যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। তারপর মটকাটিকে গলা পর্যন্ত মাটির নিচে রেখে দেয় কম পক্ষে ৪০ দিন। উপরে ৪/৫ মাস। অনেকে মটকার উপরে লাউ, কুমড়ো, সিমের গাছ লাগিয়ে দেন মটকায় ছায়া দেবার জন্য। সুপুরি গাছের ডোগলা দিয়ে বা টিন দিয়েও অনেকে ঢেকে দেন মটকার উপরের অংশ। এভাবেই একটি দীর্ঘ পক্রিয়ায় তৈরি হয় সিলেটী সিদল।

সিদল রান্নার পদ্ধতিঃ বিভিন্ন ভাবে সিদল রান্না করা যায়। আবার অঞ্চল ভেদে সিদল রান্নাতে ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যায়। কাতলা বা বোয়াল মাছের সাথে সিদল মিশিয়ে প্রচণ্ড ঝাল দিয়ে রান্না করা হয়। শাক দিয়ে সিদল রান্নার প্রচলন সুপরিচিত। মাছের মাথা রান্নায় সিদল তরকারির স্বাদ যেমন বাড়িয়ে দেয় তেমনি পুষ্টি মানও বৃদ্ধি করে। তবে সব থেকে জনপ্রিয় সিদল রান্নার পদ্ধতি হচ্ছে সিদল ভর্তা।

সিদল ভর্তা- ভাত নামানোর ৫ মিনিট আগে সিদল ভাতে দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে। পরবর্তীতে সেটি হালকা তেলে ভেজে ভাজা মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, লবণ, সরিষার তেল দিয়ে ভালো করে হাত দিয়ে বা পাটায় পিষে ভর্তা তৈরি করতে হবে। সিদল ভুনা- সিদল তাওয়ায় হালকা আগুনে ভেজে তারপর সামান্য পানি দিয়ে বেটে নিতে হবে। এরপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে মাছের টুকরা(শোল/মাগুর/পাংগাস) হলুদ ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে ভেজে নিতে হবে। এবার তেলে পেঁয়াজ দিয়ে বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত ভেজে সামান্য পানি দেওয়ার পর সব মসলা দিয়ে চার-পাঁচ মিনিট কষানো হলে তাতে সিদল ঢেলে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়তে হবে। এবার মাছের কাঁটা ছাড়িয়ে কষানো সিদলের মধ্যে দিতে হবে। এরপর কিছুক্ষণ কষিয়ে সিদলের তেল ছাড়লে নামিয়ে ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করতে হবে।

উপকারিতাঃ শরীরের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সিদল কার্যকর ভূমিকা পালন করে । রুচিবর্ধক খাবারগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এতে শুটকি থাকায় ভিটামিন-ডি এর পরিমাণ রয়েছে পর্যাপ্ত অনুপাতে। ভিটামিন ‘ডি’ হাড়, দাঁত, নখের গঠন মজবুত করার জন্য যথেষ্ট জরুরি। শরীরের জন্য উপকারী অনেক রকম খনিজ লবণ রয়েছে এতে। এছাড়াও এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার আমিষ বা প্রোটিন ও কোলেস্টেরল। কচুর ডাঁটা থাকায় এতে আয়রন, আয়োডিনের মাত্রা বেশি।বেশ সময়সাপেক্ষ বিধায় এই জনপ্রিয় খাবার টি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তবে সুখের কথা হলো- অনেক ব্যবসায়ী, রেস্টুরেবট মালিকরা এইসকল হারিয়ে যাওয়া খাবার নিয়ে কাজ করতে ক্রমেই তাদের আগ্রহ বাড়াচ্ছেন।

লেখাঃ আয়শা আকতার সুমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top