শামসুন নাহার মাহমুদ; নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম দীপশিখা।

আয়শা আকতার সুমি, ঢাবি। | প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২০ ২০:২৪; আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০ ২১:৩৭

ছবিঃ ইন্টারনেট
‘তোমাকে চিঠি লিখিতে বসিয়া আজ অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পড়িয়া গেল। একবার রাত্রি বেলায় আমরা বিহারের এক নদী পথে নৌকাযোগে যাইতেছিলাম। বাইরের অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। শুধু নদীতীরের অন্ধকার বনভূমি হইতে কেয়া ফুলের মৃদু সুরভি ভাসিয়া আসিতেছিল। ঠিক তেমনি তোমাকে কখনও দেখি নাই, কিন্তু তোমার সৌরভটুকু জানি।’- বেগম রোকেয়া শামসুন নাহার মাহমুদের লেখা পড়ে যে চিঠি লিখেছিলেন এই লাইন গুলো তার অংশ বিশেষ। বেগম রোকেয়ার সঙ্গে শামসুন নাহারের পরিচয় হয় লেখালেখির মাধ্যমে। অল্প বয়সে শামসুন নাহারের প্রথম লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয় কিশোরদের পত্রিকা ‘আঙুর’ পত্রিকায়। এরপর ‘নওরাজ’ এবং ‘সওগাত’সহ অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়।কাজী নজরুল ইসলাম তার সিন্ধু হিন্দোল কাব্যগ্রন্থ "বাহার ও নাহার"-কে (হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও শামসুন নাহার) উৎসর্গ করেন।
 
এদেশের নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে, নারী জাগরণের প্রচার ও প্রসারে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ অনন্য কীর্তি ও অবদান রেখে গেছেন। "আমি আশা করি সেদিন দূরে নয় যেদিন আমাদের সমাজের মেয়েরা শুধু বিএ পাশ করে সংবর্ধনা পাবেন না, সংবর্ধনা পেতে হলে তাঁদের আরো বড় কাজ করতে হবে"। বিএ পাস উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ ১৯৩২ সালে কথাগুলো বলেছিলেন।
 
১৯০৮ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি তৎকালীন ফেনী মহকুমার গুতুমা গ্রামে, মুন্সীবাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৌলভী মুহাম্মদ নুরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন মুন্সেফ এবং মা আছিয়া খাতুন চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাই বোনের মধ্যে বেগম শামসুর নাহার ছোট। বড় ভাই হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ছিলেন সাহিত্যমনা ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা ছিল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর নানা আবদুল আজিজ ছিলেন চট্টগ্রামে ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর অব স্কুল। তিনি শুধু উচ্চশিক্ষিতই ছিলেন না-ছিলেন উদারমনা শিক্ষাবিদ। নাহারকে ভর্তি করা হলো চট্টগ্রাম ডক্টর খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে। সমাজ আত্মীয়-স্বজনের নিন্দার ভয়ে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। কিন্তু ঘরে বন্দি থেকেও নাহার উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরেন। নিয়মিত লেখাপড়া চলল এবং তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিলেন। ফল বের হলে দেখা গেল চারটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে শতকরা আশির কাছাকাছি নম্বর পেয়ে পাশ করেছেন তিনি। ১৯২৬ সালে ডা. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সাথে বিয়ের পর শামসুর নাহার কলকাতায় যান। ডা. ওয়াহিদ মাহমুদ ছিলেন মুক্তমনা ও উদার। যিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ শল্য-চিকিৎসক ছিলেন। তাদের দুই ছেলে হয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় পরীক্ষার প্রায় ৪/৫ মাস পর নাহার ভর্তি হলেন কলকাতার ডায়োসেশান কলেজে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মামুন মাহমুদ শহীদ হন, অন্য ছেলে মইনউদ্দীন মাহমুদ একজন ক্রিকেটার এবং ক্রীড়া উদ্যোক্তা। ১৯২৮ সালে শামসুন নাহার আইএ পরীক্ষায় বিংশতিতম স্থান অধিকার করেন। পরে ১৯৩২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ডিগ্রি পাশ করলেন ডিস্টিংশন নিয়ে। দীর্ঘ ১০ বছর পর ১৯৪২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাশ করেন। ১৯২৬ সালে ডায়োসিসন কলেজে পড়ার সময় থেকে ১৯৩২ সালে বেগম রোকেয়ার মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সাত বছর বেগম শামসুন নাহার শুধু তাঁর ঘনিষ্ট সান্নিধ্য লাভের সুযোগই পাননি তাঁর সহকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগও পেয়েছেন।
 
পরবর্তীকালে তিনি বেগম রোকেয়ার নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের অংশীদার হন। বেগম রোকেয়া বহু আগেই ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা ‘নিখিল বঙ্গ’ মুসলিম মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শামসুন নাহার এই সমিতির সম্পাদিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে বাংলার মুসলিম নারী সমাজের দাবিতে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠা করেন সরকারি কলেজ। বাংলাদেশের গভর্নরের স্ত্রীর নামানুসারে কলেজের নাম হল ‘লেডী ব্রাবোর্ন কলেজ’। লেডী ব্রাবোর্ন কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা পদে যোগ দেন। এ সময় ‘নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন’ এর কলকাতা শাখায় তিনি যোগ দেন। ১৯৩৫ সালে বৃটিশ সরকার ভারত শাসন সংস্কার আইন পাশ করেন। তখন পর্যন্ত ভারতীয় নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। এই সময় শামসুন নাহার নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের কলকাতা শাখার তরফ থেকে এদেশের মেয়েদের ভোটাধিকার নিয়ে ব্যাপকভাবে আন্দোলন চালাতে থাকেন। ফলে ভারতীয় নারীদের ভোটাধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আইন পাশ হয়। যার ফলে এদেশের মেয়েরা ভোট দেয়ার অধিকার পেলেন। এছাড়াও আন্দোলনের কারনে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার কয়েকটি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনে বাংলার মুসলমান নারী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ফলে তিনি স্বামী পুত্রসহ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং রাজধানী ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি বাংলা একাডেমীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব উইমেন’-এর সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনে ছয় সদস্য বিশিষ্ট পাকিস্তানি নারী প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। পরে তিনি সমগ্র এশিয়ার জন্য এই আন্তর্জাতিক মৈত্রী সংঘের আঞ্চলিক পরিচালক হয়েছিলেন। দেশভাগের কয়েক বছর পর ঢাকায় নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম ক্লাব’এর তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা লেডিস ক্লাবের সভানেত্রী ছিলেন। শামসুন নাহারের চেষ্টায় ১৯৬১ সালে ‘পঙ্গু শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র’ স্থাপিত হয়। তিনি ১৯৬৩ সালে সমগ্র পাকিস্তান শিশু কল্যাণ পরিষদের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে লন্ডনে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘পারিবারিক আইনে নারীর মর্যাদা’ সম্পর্কে একটি সভা হয়। এতে পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে শামসুন নাহার যোগদান করেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘পুণ্যময়ী’(১৯২৫), ‘ফুল বাগিচা’(১৯৩৫), ‘বেগম মহল’(১৯৩৬), ‘রোকেয়া জীবনী’(১৯৩৭), ‘শিশুর শিক্ষা’(১৯৩৯) ‘আমার দেখা তুরস্ক’(১৯৫৫), ‘নজরুলকে যেমন দেখেছি’(১৯৫৮) প্রভৃতি।
 
‘সবুজপাঠ’, ‘কিশোর সাথী’, ‘তাজমহল পাঠ’, ‘নতুন তাজমহল পাঠ’, ‘বিচিত্র পাঠ্য’ প্রভৃতিসহ বেশ কয়েকটি পাঠ্য পুস্তকও রচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৪৪ সালে বৃটিশ সরকার তাঁকে শিক্ষাক্ষেত্র ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এমবিই উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বেগম শামসুন নাহার মাহমুদকে মরণোত্তর ‘বেগম রোকেয়া পদক, ১৯৯৫’ প্রদান করে। ১৯৬৪ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র ৫৬ বৎসর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রীদের একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয় শামসুন নাহার হল।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top