ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী।

অগ্নিকন্যা লীলা নাগ।

আয়শা আকতার সুমি, ঢাবি। | প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২০ ২০:৩০; আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২০ ২০:৪২

ছবিঃ লীলা নাগ।
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের আস্থার জায়গা শুধু মাত্র তারা নিজেরাই। আর সেই আস্থার জায়গা আজ তৈরি হয়নি। সেই রাস্তা দেখিয়ে গিয়েছিল আমাদের কিছু মহীয়সী নারীরা। আজ তাদের মধ্যে একজন কে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবো আমরা। তিনি হলের লীলা নাগ। যার হাত ধরে বা যার জেদের জন্য বাংলার মেয়েদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে যাত্রা শুরু। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের মেয়ে লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। জন্মগত নাম শ্রীমতি লীলাবতী নাগ। মা-বাবা আদর করে ডাকতেন ‘বুড়ি’। পিতা গিরীশচন্দ্র নাগ ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট। মা কুঞ্জলতা ছিলেন গৃহিনী।
 
১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং একমাত্র নারী শিক্ষার্থী লীলা নাগ ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-শিক্ষার প্রচলন ছিল না। কিন্তু মুক্তি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোদ্ধা বিপ্লবী লীলা নাগের অদম্য ইচ্ছা জেদ এবং দৃঢ়তার কাছে হার মানেন প্রতিষ্ঠাতা ইংরেজ ড. হার্টস। সবেমাত্র লীলা নাগ কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। তার জেদ, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বেন। মেয়েরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না এই মর্মে লীলা চ্যান্সেলর (বাংলার গভর্ণর) ও ভাইস চ্যান্সেলরের সাথে দেখা করে নিজের কেস প্লীড করেন।
 
তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর পি জে হার্টজ লীলার মেধা ও আকাঙ্খা বিবেচনা করে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিশেষ অনুমতি প্রদান করেন। তার ভর্তি ক্রমিক নাম্বার ছিল ২৫। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ড. হার্টস অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রথা ভেঙে তাকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের এমএ ক্লাসে ভর্তির সুযোগ করে দেন। ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এমএ সম্পূর্ণ করেন তিনি। উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি নারী সাংবাদিক লীলা নাগ। তার বাবা গিরীশচন্দ নাগ আসাম সরকারের জেলা হাকিম হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে চাকরি সূত্রে লীলা নাগের পরিবার আসামের বাসিন্দা হয়। মা কুঞ্জলতা নাগ ছিলেন গৃহিণী। ১৯০৫ সালে আসামের দেওগর বিদ্যালয়ে লীলা নাগের শিক্ষাজীবন শুরু। সেখানে দুই বছর অধ্যয়নের পর ভর্তি হন কোলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে। ১৯১১ সালে ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
 
কলেজে অধ্যয়নকালীন সময়ে বড়লাটের পত্নীকে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথা বাতিলের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে ২০ টাকা বৃত্তি পেয়ে আইএ পাশ করেন লীলা। লীলা নাগ এককভাবে বারবার এসেছেন আলোচনায়, লাভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীর মর্যাদাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিশন রেজিস্টার থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। এরপরের তিন শিক্ষাবর্ষে আর কোনো ছাত্রী ভর্তি হয়নি। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাবস্থাতেই লীলা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও ঋষি রামানন্দের সাহচর্য লাভ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা লীলা নাগ বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা স্বরুপ ঢাকার আরমানিটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল এবং শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি দীপালি ছাত্রী সংঘ ও মহিলা আত্মরক্ষা কেন্দ্রও গড়ে তোলেন। বিপ্লবী পুলিন দাসের নেতৃত্বে মেয়েরা এখানে অস্ত্র চালনা ও লাঠিখেলা শিখতেন।
 
ভারত বিভাগের পর লীলা নাগ কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েন। লীলা নাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নেত্রী ছিলেন। এ জন্য কয়েকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি ‘জয়শ্রী’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। লীলা নাগ ছবি আঁকতে, গান গাইতে এবং সেতার বাজাতে পারতেন। দীপালি সংঘ তৈরির আগে থেকেই লীলা বিপ্লবীদের সাথে জড়িয়ে গেছিলেন। ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেস ও বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলো সুভাষচন্দ্র বসুর চারপাশে সমবেত হতে থাকে। স্বামী অনিল রায়, আরেক বিপ্লবীকে নিয়ে লীলাও উপস্থিত হন সেখানে। নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনে বাংলার নারী আন্দোলনের ইতিহাস বলার সময় লীলা প্রথম মঞ্চে ওঠার মাধ্যমে তার বিপ্লবী জীবনের পথ আরো প্রশস্ত হয়। নেতাজির অনুরোধে তার প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক ফরওয়ার্ড ব্লকের সম্পাদনার ভার নেন লীলা। প্রীতিলতার মতো সুপরিচিত নারী বিপ্লবীরাও এই দীপালি সংঘের মাধ্যমেই বিপ্লবের পাঠ নিয়েছিলেন লীলা নাগের কাছ থেকে।
 
দীপালি সংঘ ছাড়াও অনিল রায়ের শ্রীসংঘের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। শ্রীসংঘের সদস্যরা সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার জন্যে অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরির কাজ করতেন। বোমার ফর্মুলা নিয়ে কাজ করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র অনিল দাস ও শৈলেশ রায়। ১৯৩১ সালে বিপ্লবীদের কার্যকলাপ আরও জোরদার হয়। পরপর বেশ কিছু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা জজ বিপ্লবীদের হাতে নিহত হন। এর মধ্যে কুমিল্লার জেলা জজ স্টিভেন্সের হত্যার সাথে দু’জন তরুণী জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর দীপালি সংঘের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে লীলা নাগকে গ্রেপ্তার করা হয়।
 
১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৭ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত লীলা ঢাকা, রাজশাহী, সিউড়ী, মেদিনীপুর জেল ও হিজলী বন্দিশালায় আটক ছিলেন। ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক হওয়া প্রথম নারী রাজবন্দী লীলা। ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর অনিল-লীলা দম্পতি পূর্ববঙ্গে বসবাসের উদ্যোগ নেন। পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু রক্ষা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তারা। এ সময় কবি সুফিয়া কামাল কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলে লীলা নাগ তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ১৯৫১ সালে ভারত সরকার প্রণীত উদ্বাস্তু উচ্ছেদের বিলের বিরোধীতা করে আবারও গ্রেপ্তার হন লীলা। ১৯৫২ সালে লীলা নাগের স্বামী অনিল রায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিয়ের মাত্র ১৩ বছরের মাথায় অকাল বৈধব্য ও বহুদিনের আন্দোলন- সংগ্রামের সাথীকে হারিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন লীলা। 
 
তবে কম সময়ের মধ্যেই শোক কাটিয়ে স্বদেশের বৃহত্তর স্বার্থে পুনরায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে পূর্ববাংলা বাঁচাও কমিটির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পুলিশ লীলা নাগকে গ্রেফতার করে। ১৯৬৬ সালে ছাড়া পাবার পর তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাকে কলকাতার পি.পি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ দিন পর সংজ্ঞা ফিরে এলেও বন্ধ হয়ে যায় তার বাকশক্তি। শরীরের ডান অংশ সম্পূর্ণরুপে অচল হয়ে যায়। এভাবেই আড়াই বছর চলার পর ১৯৭০ সালের ১১ জুন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এই মহানায়িকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী, উপমহাদেশের নারী সমাজের জাগরণের প্রথম অগ্রদূত, অগ্নিকন্যা লীলা নাগ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top