তবে কি মীনা চরিত্রকে আবারও দরকার??

মাকসুদা তমা, ঢাবি। | প্রকাশিত: ৯ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:৩৬; আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:৩৯

ছবিঃ সংগৃহীত

"আমি বাবা মায়ের শত আদরের মেয়ে...."

- এই লাইনটা শোনার সাথে সাথে ৯০ দশকের ছেলেমেয়েদের মাঝে একরকম আবেগ কাজ করে।

আমার এখনও মনে পড়ে ছোটবেলায় যেখানেই থাকতাম না কেন মীনার কার্টুন এর শব্দ শুনলেই এক দৌঁড়ে টিভির সামনে চলে আসতাম।

কী ছিল এই মীনার কার্টুনে?
কেনই বা এত জনপ্রিয়?

- আমি বলবো এ দেশের মানুষকে প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে "সমতা" শিখিয়েছে মীনা। এদেশে নারীবাদী আন্দোলন জানা বোঝার বহুত আগেই মীনা বুঝিয়েছে ছেলেমেয়ে দুজনই যখন সংসারের কাজ সমানভাবে করতে পারে তবে খাবারের ভাগের সময় কেন ছেলেরা বেশি পাবে?

ওই যে "মেয়েদের যত্ন নাও" পর্ব টাতে মা রাজুর প্লেটে ডিম বেশি দিলে মিঠু টুক করে ডিমের অর্ধেক মীনার প্লেটে তুলে দেয়।

এই দৃশ্য দেখে আমি হলপ করে বলতে পারি এদেশের মা সমাজের অনুভূতি একটু হলেও নাড়া দেয়ার কথা।

সমতা ছাড়াও মেয়েদের বাল্যবিবাহ, যৌতুক বন্ধে সচেতনতা মূলক যে পর্বগুলো ছিল বড় ছোট সকলের কাছেই সমাদৃত ছিল।

আর ইভটিজিং নিয়ে দিপুর ওই নাকানি চুবানি খাওয়ানোর দৃশ্য দেখলে যেকোনো ওই বয়সী ফাজিল ছেলেই লজ্জা পেতে বাধ্য। আর তার সাথে মেয়েরাও যে চাইলে ইভটিজারদের এরকম শাস্তি দিতে পারে এই শিক্ষাটুকু ওই বয়সের যেকোনো মেয়েই আসলে মীনা দেখে শিখতে পারতো!

একদম অন্ধকার এক যুগ থেকে কিছুটা আলোর পথে আশার পথে "মীনার কার্টুন" এর পদাচারণা শুধু নারীর অধিকার বা অবমূল্যায়ন নয় সমাজের অনেক অসংগতিকেই কমিকস এর মাধ্যমে খুব সহজভাবে তুলে ধরতো।

৯০ দশকের ওই সময়টায় যখন সারাবিশ্ব বিভিন্ন পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকেছিল, বিভিন্ন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সকল পুরাতন ধ্যান ধারণা কে বদলে দিয়ে নতুনভাবে তৈরি হচ্ছিল ঠিক সেই সময়টা আমাদের বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলটাই কেমন অন্ধকারেই নিমজ্জিত ছিল।

কিন্তু ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি অ্যানিমেটেড কার্টুন চরিত্রের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীর পরিচয় ঘটলো "মীনা" নামের একটি সাধারণ ৯ বছরের মেয়ের সাথে। যার চরিত্র ছিল সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের থেকে ভিন্ন। যে ছিল সচেতন, কর্মোদ্যোম, নারীবাদী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং সর্বোপরী বৈপ্লবিক মতবাদের অধিকারী।

মূলত "ইউনিসেফ বাংলাদেশ" দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করার মাধ্যমে এই চরিত্রটি তথা ধারাবাহিকটির মূল চরিত্র, কাহিনী, চিত্রনাট্য ও গল্প তৈরি করে। 'মোস্তফা আনোয়ার', 'শিশির ভট্টাচার্য ' সহ শীর্ষ স্থানীয় বেশ কিছু বাঙালি শিল্পী এই চরিত্রগুলো তৈরি করেন।

বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, নেপালি, পোশ্ত ও পর্তুগীজ ভাষায় এই এ্যানিমেটেড ধারাবাহিক কার্টুনটি প্রচারিত হয়। এটি প্রচারের পরপর এতই সাড়া ফেলে দেয় যে এটি ধারাবাহিক ছড়িয়ে কমিক বই এ রূপান্তরিত হয় এবং বিবিসি এর মাধ্যমে বেতারেও প্রচারিত হয়।ইউনিসেফ এর ৭০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে গুগল প্লে স্টোরে এই ধারাবাহিকটির উপর ভিত্তি করে "মীনা গেম" নামে একটি ফ্রী এ্যাপ চালু করে।

এমনকি ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের ৯৫% মানুষ মীনা'র সম্পর্কে অবগত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ২০০৫ সালের পর থেকে আর কোনো নতুন কন্টেন্ট এ মীনার কার্টুন প্রচারিত হয় না।

সম্প্রতি করোনা মহামারীতে হাত ধোয়ার সচেতনতা নিয়ে একটি এপিসোড প্রচার করা হয়। এবং এই নতুন পর্বটিও অনলাইন, অফলাইনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে ৯০ দশকের ওই মীনাকে কি এখন আর আমাদের দরকার নাই?

এই যে প্রতিনিয়ত ধর্ষন, নারীর প্রতি নির্যাতন, অনলাইনে নারীর হ্যারাজমেন্ট আর তার সাথে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনাকে ভেঙ্গে সাম্প্রদায়িক বানানোর যে ঘৃণ্য কৌশল তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আরেকজন "মীনা"র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়ে দিচ্ছে।

আমাদের এই নতুন প্রজন্ম হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা শিখে নিয়েছে, বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা কিংবা যৌতুক কে নেগেটিভভাবে দেখতেও শিখেছে। তাই তারা আর পুরাতন মীরাকে দেখে মজা পায় না।

কিন্তু এই প্রজন্ম জানে না অনলাইনে মেয়েদেরকে কমেন্ট কিংবা ইনবক্সে উত্যক্ত করা যায় না। আমাদের এই ইন্টারনেট প্রজন্ম জানে না "জেন্ডার ইকুইটি" কি কিংবা শিখতে পারছে না আসল ধর্মীয় মূল্যবোধ কাকে বলে আর কোনটাকে বলে গোঁড়ামি বা মৌলবাদী আচরণ।

তাই এই প্রজন্মের আবারও একটি "মীনা" চরিত্র চাই। যে তাদের সময়ের উপযোগী করেই সহজ সরল কমিকস গল্পের মাধ্যমে সচেতনতার স্বরূপ শেখাবে। আবারও ছোট-বড় সকলের চিন্তার জগতে একটু ধাক্কা দিবে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top