জননী সাহসিকার ২০তম প্রয়াণ দিবস।

মাকসুদা আকতার তমা, ঢাবি | প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২০ ১৯:৪৪; আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২০ ২০:০০

ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৯৯ সালের এই দিনটিতে পরলোকগমন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, এদেশের নারী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব "সুফিয়া কামাল"। শৈশব থেকেই এদেশের ছেলেমেয়েরা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে তাঁর লেখার সাথে পরিচিত হলেও তার মহৎ জীবন আদর্শ ও সাহিত্যকর্মের সাথে খুব কমই জানাশোনা থাকে সবার। ১৯১১ সালের যে সময়ে তাঁর জন্ম তখন নারীশিক্ষা তো দূরের কথা নারীদেরকে সামান্যতম মানুষের অধিকার পর্যন্ত দেওয়া হতো না। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠা এবং বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে অসাধারণ সব সৃষ্টি উপহার আসলেই অনন্য দৃষ্টান্ত ছিল। শিশু বয়স থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

১৯১৮ সালে তিনি মায়ের সাথে কলকাতা যান এবং সেখানে গিয়ে তার পরিচয় হয় "বেগম রোকেয়ার" সাথে। সেই সময় থেকেই তিনি রোকেয়া দর্শনকে নিজের আদর্শ ভাবতে শুরু করেন। এবং পরবর্তী জীবনে নারী জাগরণ নিয়ে রোকেয়ার অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার ব্রতে মনোনিবেশ করেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি মেয়েদের প্রথম হলের নাম "রোকেয়া" রাখার দাবি তিনিই প্রথম উত্থাপন করেন। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২ সালে তার নামেও একটি নতুন মেয়েদের হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর একে একে পরিচয় ঘটতে থাকে কাজী নজরুল ইসলাম, রবিঠাকুর, শরৎচন্দ্র এমনকি মহাত্মা গান্ধীর সাথেও। গান্ধীর স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতাও কাটেন এবং এই সময়েই যোগদান করেন নারীকল্যাণমূলক সংগঠন "মাতৃমঙ্গল" এ। এ থেকেই বোঝা যায় তিনি কেবল সাহিত্য অঙ্গন নয় বরং রাজনৈতিক স্বাধিকার নিয়েও চিন্তাভাবনা করতেন। তার বাস্তব প্রমাণ আমরা পাই ভাষা আন্দোলনের সময় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনের সময় এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দুই মেয়ে যোগদান করেন এবং আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য হাসপাতাল নির্মাণ করেন।

তবে সুফিয়া কামালের সাহিত্য চর্চায় বড় ভূমিকা রাখেন তাঁর প্রথম স্বামী নেহাল হোসেন। ১৯২৩ সালে বিয়ে হওয়ার পর পরই তিনি তাকে সমসাময়িক সাহিত্য ও পত্রিকার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ প্রদান করেন। নেহাল হোসেন এ্যাকসিডেন্টে আকস্মিক মারা গেলে তার জীবনে নেমে আসে শোকের ছায়া এবং ওই সময় তাঁরই স্মৃতিতে তিনি "তাহারেই পড়ে মনে" কবিতাটি রচনা করেন। সুফিয়া কামালের সর্বপ্রথম গল্প "সৈনিক বধূ" প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে বরিশালের তরুণ পত্রিকায়। এরপরই একে একে তিনি লিখতে থাকেন সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি অসামান্য সব কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাঁঝের মায়া কাব্যগ্রন্থটি। এর ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এবং বলেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা।’ এর মাধ্যমেই সুফিয়ার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর আপনজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ইচ্ছায় তিনি চট্টগ্রামের লেখক ও অনুবাদক কামালউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পুনরায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। সেই থেকে তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিত হন।

সুফিয়া কামাল ‘একালে আমাদের কাল’ নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাতে তার ছোটবেলার কথা এবং রোকেয়া-প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। তিনি অনেক ছোটগল্প এবং ক্ষুদ্র উপন্যাসও রচনা করেছেন। কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) তার একটি উল্লেখযোগ্য গল্প গ্রন্থ। তার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭), উত্তপ্ত পৃথিবী (১৯৬৪), অভিযাত্রিক (১৯৬৯) ইত্যাদি। তার কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তার সাঁঝের মায়া গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও তার বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি তার কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ দিয়ে Mother of Pears and other poem এবং ২০০২ সালে সুফিয়া কামালের রচনা সমগ্র প্রকাশ করেছে। কেয়ার কাঁটা সমেত সুফিয়া কামালের মোট প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ সংখ্যা চার। অন্য তিনটি হলো– সোভিয়েটের দিনগুলি (ভ্রমণ, ১৯৬৮), একালে আমাদের কাল (আত্মজীবনীমূলক রচনা, ১৯৮৮) এবং একাত্তরের ডায়েরী (১৯৮৯)। অগ্রন্থিত গদ্যের মধ্যে রয়েছে একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস অন্তরা। বৈশাখ ১৩৪৫ থেকে পাঁচ কিস্তিতে অন্তরা প্রকাশিত হয় কলকাতার মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। এর পরে আছে আর একটি ছোট্ট উপন্যাস (Novella) জনক। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রিমিয়ায় স্বাস্থ্য নিবাসে ১৯৭৭ সালে ৬ থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে মাত্র ১৫ দিনে সুফিয়া কামাল জনক রচনা করেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত নূরজাহান বেগম সম্পাদিত সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় ১২ সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় (৩০ বর্ষ ৩৭ থেকে ৪৮ সংখ্যা, ১৯ মার্চ, ১৯৭৬ থেকে ৪ জুন, ১৯৭৮)। উপন্যাস দু’টি সংগ্রহের কাজ চলছে।

১৯৪৮ সালে সুফিয়া ব্যাপকভাবে সমাজসেবা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন। এবছরই তাঁকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে তাঁর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সুলতানা পত্রিকা, যার নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থের প্রধান চরিত্রের নামানুসারে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমননীতির অঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ সালে ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ (বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতাপ্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন তিনি এর সঙ্গে জড়িত থাকেন।

এই মহান কবি ও লেখক ভূষিত হয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায়।১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন; কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), Women’s Federation for World Peace Crest (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) ইত্যাদি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের Lenin Centenary Jubilee Medal (১৯৭০) এবং Czechoslovakia Medal (১৯৮৬) সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেন। এই মহান মানুষটির প্রয়াণ দিবসে আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। "জননী সাহসিকা" খ্যাত এই মানুষটা নারীর অধিকার তথা শিক্ষা সকল বিষয় নিয়ে কাজ করে গেছেন সারা জীবন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আলাদা চিন্তা ভাবনা মূল্যবোধের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন সবসময়।তিনি বিশ্বাস করতেন যতি না এদেশের প্রতিটি নারী নিজেই নিজের অধিকার বুঝে নিতে শিখবে,যতদিন না নিজ কর্মগুণকে প্রতিষ্ঠা করতে শিখবে,যতদিন না আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠবে ততদিন এদের মুক্তি নেই। তাই আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তার এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হাজারো নারী বর্তমানের সাহিত্য অঙ্গনে প্রবেশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করবে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top