অনাকাঙ্খিত সিজার বন্ধ হোক।

বাচ্চা প্রসবে ভয় নয়; রাখতে হবে জ্ঞান।

রুবাইয়া বিনতে রাজ্জাক, ফাউন্ডার, হ্যাপি প্যারেন্টিং | প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২০ ০০:৩৭; আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২০ ২৩:৪৪

ছবিঃ ইন্টারনেট
'এপিসিওটমি' শব্দটি শুনেছেন কখনো? বাংলায় যাকে বলে সাইড কাটা। অর্থাৎ বাচ্চা প্রসবকালে ভেজাইনার মুখ সামান্য কেটে দেয়ার পদ্ধতিকে ইপিসিওটমি বলে। অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিতরা তো বটেই বাংলাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীরো একটা বড় অংশ এই পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। যার ফলাফল অনাকাঙ্ক্ষিত সিজারিয়ান অপারেশনের। একজন মাকে নরমাল
 
ভেজাইনাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তানকে পৃথিবীতে আনবার জন্য কিছু বেসিক বিষয়াদি নিশ্চিত করবার প্রয়োজন হয়।
 
প্রথমত, অনাগত বাচ্চাটা নরমাল। স্বাভাবিক ওজন, সুন্দর হার্ট রেইট, পূর্নাংগ বয়স, প্লাসেন্টা জায়গা মত, বাচ্চার মাথা নিচে, জরায়ুর পানি ঠিকঠাক। কোন জন্মগত বা আকৃতিগত ত্রুটি নাই। কোন ইনফেকশন নাই।
 
দ্বিতীয়ত, মা নরমাল। লম্বা হাইট, কোমড় চওড়া। কিশোরি বয়স থেকেই রেগুলার শারিরিক পরিশ্রম করা মা। হাড় হাড্ডি আর লিগামেন্ট গুলো ফেক্সিবল। প্রচুর দম। রক্তে এনিমিয়া নাই। জরায়ু মুখে কোন সমস্যা নাই। কোন ইনফেকশন নাই। গর্ভকালীন কোন রোগ ব্যাধি নাই।
 
তৃতীয়ত, পরিস্থিতি নরমাল। মানে আত্মীয় স্বজন আশে পাশে আছে। রক্ত লাগলে ব্লাড দেবার লোক আছে। অক্সিজেন লাগলে দেয়া যাবে। চাইলেই বড় ডাক্তার, ওটি, অপারেশন সব করা যাবে। টাকা পয়সা গুছানো আছে।
 
★নরমাল ডেলিভারি কয় প্রকার?
_নরমালি নরমাল - সাইড কেটে নরমাল - সাইড কেটে ভেনটোজ বসিয়ে বা ফরসেপ যন্ত্র ভেতরে ঢুকিয়ে টান দিয়ে বাচ্চা বের করে নরমাল(3 ediots মুভিতে যেমনটা দেখানো হয়েছিল) - এপিডুরাল এনেস্থেশিয়া দিয়ে ব্যাথামুক্ত নরমাল।
নরমালি নরমাল: সাধারণত লম্বা মা, কোমড় চওড়া, বাচ্চা সাইজে ছোট, প্রথম বাচ্চা না, তীব্র লেবার পেইন, এবং দম ভালো এমন মা'দের সহজেই দশ ইঞ্চির জরায়ু মুখ দিয়ে, বাচ্চার দশ ইঞ্চির মাথা বের হয়ে আসে। তবে এই রকম ডেলিভারি প্রথমবার পাওয়া কঠিন।
 
সাইড কেটে নরমাল: বাচ্চার স্বাস্থ্য আর মাথা একটু বড় হলে, মায়ের চাপ দেবার জোর কমে গেলে, লম্বা সময় বাচ্চা যোনী পথে আটকে থাকলে মায়ের যোনীর এক সাইডে অল্প করে কেটে যায়গাটা বড় করে দেয়া। এতে বাচ্চা সহজে বের হয় যায়। সাধারণত বাচ্চা প্রসবের এক ঘন্টার মধ্যেই এপিসিওটমি সেলাই করা হয়৷ এমনভাবে সেলাই দেয়া হয় যেন তা মিলিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সেলাই কাটার জন্যে হাসপাতালে যেতে না হয়। ভয় নেই,কারন সেলায় করবার সময় অবশই ডাক্তার রা লোকাল এ্যানস্থেসিয়া দিয়ে নেয়। অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেলাই দিলে এবং প্রোপার হাইজিন মেইনটেইন করলে জায়গাটা এক মাসের(৩০ দিনের)মধ্যেই আবার আগের মত হয়ে যায় এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফেরা যায়। এই সাইডের কাটা আর সেলাই বেশ মুনশিয়ানার কাজ। তাই কখনোই বাড়িতে নার্স কিম্বা দাই ডেকে নয়, হাসপাতালে ডেলিভারি করানো জরুরি।
 
এসিস্টেড বা ফরসেপ্স ভেনটোজ দিয়ে বাচ্চা বের করা নরমাল: নরমালে বাচ্চা হবে, সাইড কাটা হল, কিন্তু মায়ের চাপ দেবার শক্তি একেবারেই নাই। বাচ্চা আটকে গেছে। এই অবস্থায় সিজার করা যায় না। উপস্থিত দক্ষ ডাক্তার থাকলেই কেবল উদ্ধার পাওয়া সম্ভব। থ্রি ইডিয়ট মুভিতে দেখানো গোল কাপের মত একটা জিনিস বাচ্চার বের হতে চাওয়া মাথায় বসিয়ে বাতাসের নেগেটিভ প্রেশারে টান দেয়া হয়। বা চামচের মত দুইটা স্টিলের জিনিস জরায়ুতে ঢুকিয়ে বাচ্চার মাথা আঁকড়ে বের করে আনা হয়।
 
এপিডুরাল এনেস্থিসিয়া দিয়ে নরমাল: সৃস্টিকর্তার এক অনন্য উপহার এপিডুরাল এনেস্থেসিয়া। কোটি কোটি বছরের মা'দের নির্মম প্রসব যন্ত্রনাকে মোটামুটি ১০% থেকে ৪০% কমাতে পারে এপিডুরাল এনেস্থেসিয়া। তবে মায়ের শরীর ব্যাথা নাশক এই ইনজেকশন নেবার যোগ্য কিনা এটা আগেই দেখে রাখা হয়। বাচ্চার নড়ন চড়ন ঠিক থাকলে সময় মত এই ইনজেকশন দেয়া হয় পিঠে। এতে করে সীমাহীন ব্যথা সহনীয় হয়। এটা ব্যয় বহুল পদ্ধতি। এক্সপার্ট ডাক্তার না দিলে পরবর্তীতে নানা জটিলতা হয়।
 
সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও এপিসিওটমি লাগতে পারে, এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই৷ ডেলিভারীর আগেই ডাক্তারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে আপনার সুবিধা-অসুবিধা জানাবেন৷ ডাক্তাররা কখনোই দরকার ছাড়া এপিসিওটমি করে না৷ একান্তই দরকার পড়লে করতে হয়৷ আর কাটার পরিমাণের উপর নির্ভর করে এক এক জনের এক এক সময় সেরে ওঠে৷ আর একটা কথা বলতে চাই, প্রসব এর এত কঠিন ব্যথা যদি আমরা সহ্য করতে পারি তাহলে আমাদের সন্তানের সুস্থতার জন্য আর একটু কষ্ট মেনে নেওয়ায় যায়, তাইনা! নতুন বাবা মা'য়ের জন্য এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি কেননা ইপিসিওটমি নিয়ে প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যা হবু বাবা মায়ের মনে অযাচিত ভীতির সঞ্চার করে। সব হবু মায়েদের জন্য শুভকামনা।
 


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top