নারীর অর্গাজম, মিথ নাকি অসচেতনতা?

নারীকথন | প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২০ ০৩:২২; আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২০ ১১:১৫

ছবিঃ ইন্টারনেট
ইন্টারকোর্সের মাধ্যমে দুইটি দেহের মিলন হয় না কেবল সেই সাথে মিলন ঘটে দুজন মানুষের মানসিকতার। যেহেতু দুই পক্ষের অংশগ্রহণেই কাঙ্ক্ষিত কোন সুখ পরিনত হবে তাহলে কেন সেই সুখের ভাগী দুই পক্ষই হবে না?
 
অর্গাজম: অর্গাজমের ক্ষেত্রেও পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজ বৈষম্যের শক্ত তার এটে দিয়ে রুদ্ধ করে দেয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে।যা স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করতে পুরুষের নারীর সহযোগিতা লাগবেই তা নারীর জন্য নাকি অছ্যুৎ! নারী যদি তার অর্গাজমের কথা ভাবে বা বলে ফেলে তার সঙ্গীকে তাহলে এখনো তাকে চরিত্রহীন, বেহায়া শব্দগুলো শুনতে হয়।
বিভিন্ন সার্ভের মাধ্যমে জানা গিয়েছে অনেক মহিলাই নিজেদের অর্গাজম সম্পর্কেই ঠিকভাবে জানেন না বা বুঝতেই পারেন না! তাঁরা হয়ত শারীরিক মিলনে অংশগ্রহণ করেন ঠিকই, কিন্তু তার সুখানুভূতিটা উপভোগ করতে পারেন না। ফিমেল ইজাকুলেশন (ejaculation) বা অর্গাজম (orgasm) রকেট সায়েন্স না হলেও সায়েন্স বটে!
 
বিজ্ঞান বলে, ইন্টারকোর্স বা যৌনমিলনের সময় চরম শারীরিক ও মানসিক আনন্দের থেকে সেক্সুয়াল স্টিমুলেশন হয়। এই সময় শরীর থেকে এন্ডোরফিন্স নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এই সময়কেই অরগ্যাজম বলা হয়। পুরুষের অর্গাজমের সাথে তাদের বীর্যপাত ঘটলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে অর্গাজম ঘটা সম্পূর্ণভাবে মানসিক একটি ব্যাপার। মানসিকভাবে মেয়ে যদি তার সঙ্গীর উপর নির্ভার থাকে, কমিউনিকেটিভ হয় তাহলে উভয়েরই অর্গাজম হয়। পুরুষদের থেকে মহিলাদের অরগ্যাজমে সময় বেশি লাগে। চূড়ান্ত উত্তেজনায় পৌঁছতে নারীর ক্ষেত্রে শারীরিকের পাশাপাশি মানসিক আনন্দও অত্যন্ত জরুরি। তাই দীর্ঘ সময় অরগ্যাজম না হলে মহিলাদের মধ্যে অ্যানঅরগ্যাজমিয়া নামক মানসিক সমস্যা দেখা যায়। গবেষকদের মতে, বিশ্বে প্রতি ১০০ মহিলার মধ্যে ১৫ জনই এই রোগে ভোগেন।
 
অর্গাজমে সময়: পুরুষের তুলনায় নারীর অর্গাজমে পৌঁছাতে বেশ অনেকটা সময় বেশি লাগে। আসলে মহিলাদের যৌনাঙ্গ পুরুষদের যৌনাঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি জটিল, ফলে অর্গাজমে পৌঁছতে মহিলাদের সময় অনেক বেশি লাগে। এছাড়া আরও অনেকগুলো ব্যাপার এখানে কাজ করে, কিছু মহিলা তাঁদের ‘জি-স্পট’-এ স্পর্শ করলেই উত্তেজিত হয়ে যান। আবার কেউ লজ্জা এত বেশি পান যে, অর্গাজমে পৌঁছতেই পারেন না।
 
অর্গাজমের ধরন: নারীর নয় রকমের অর্গাজম হতে পারে। এক দিনেই আবার বিভিন্ন দিনেও হতে পারে। তবে সব মহিলার যে এরকম যৌন অভিজ্ঞতা হতেই হবে, তা কিন্তু নয়। আপনি হয়তো ‘জি-স্পট’-এর কথা শুনেছেন, বেশিরভাগ মহিলার ঘাড়ের কাছে অথবা পিঠের দিকে এই স্পট থাকে যেখানে পুরুষের স্পর্শ হলে মহিলারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন; কিন্তু ‘জি-স্পট’ ছাড়াও ‘সি-স্পট’, ‘ও-স্পট’, ‘এ-স্পট’-ও থাকে একজন মহিলার। তা ছাড়া একজন মহিলার ক্লিটোরাল অর্গাজম, ভ্যাজাইনাল অর্গাজমও হতে মহিলাদের অর্গাজম পুরুষদের তুলনায় দেরিতে হলেও তার রেশ কিন্তু বেশ অনেকক্ষণ থাকে। সাধারণত অর্গাজমের অনুভূতি পুরুষদের মধ্যে সাত সেকেন্ড পর্যন্ত থাকে, সেখানেই মহিলাদের এই সুখানুভূতি ২৭ সেকেন্ডের বেশি সময় পর্যন্ত বজায় থাকে। আর মহিলাদের তো একবার না, বারবার অর্গাজম হতে পারে!
 
ইজাকুলেশন ও অর্গাজম: অনেকেই ইজাকুলেশন এবং অর্গাজমের মধ্যে তফাত বুঝতে পারেন না। অর্গাজম হলেই যে ইজাকুলেশন হবে তার কোনও মানে নেই কিন্তু! কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে তাঁরা অর্গাজমে পৌঁছলে তাদের ইজাকুলেশন হবেই!
 
অর্গাজম কিসের উপর নির্ভর করে? অনেকদিন ধরে অজানা থাকলেও নারীর অর্গাজম না হওয়ার উত্তর উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। নারীর শারীরিক গঠনের উপরই নারীর অর্গাজম নির্ভর করে বলে জানানো হয়েছে নতুন এ গবেষণায়। সেক্সুয়াল অ্যানাটমির উপর করা একটি গবেষণা ফল পর্যালোচনা করে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মায়ো ক্লিনিকের গবেষকরা একটি তথ্য দেয় অধ্যাপক ড. এলিজাবেথ এমাহার্ডের নেতৃত্বে। তাদের ওই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ক্লিনিক্যাল অ্যানাটমি নামক জার্নালে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম এবং সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের উপর নির্ভর করে পুরুষের বীর্যপাত। কিন্তু নারীর অর্গাজম নির্ভর করে তার দৈহিক গঠন এবং পুরুষাঙ্গ কিংবা যৌনাঙ্গে প্রবেশ করানো জিনিসটি কীভাবে সেখানে প্রবেশ করল তার উপর। বিষয়টি নিয়ে এলিজাবেথ বলেন, "যৌন মিলনের উপর মানুষের যতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে পূর্বে ধারণা করা হতো ততটা হয়ত নেই। তিনি বলেন, বীর্যপাত খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া যা মানুষের মানসিক, শরীরিক এবং দৈহিক গঠনের উপর নির্ভর করে।"
 
অর্গাজমের ফলাফল বা প্রয়োজনীয়তা: প্রকৃতি অন্যান্য প্রাণীদের মতোই প্রজননের বিষয়টি মাথায় রেখেই মানুষকে তৈরি করেছে। তাই যৌনতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শরীর-স্বাস্থ্যের একাধিক বিষয়। Why is orgasm important to women's health?
পুরুষ ও নারী, দু’জনের শরীরেই যৌনাঙ্গ তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক নিয়মেই। যৌনাঙ্গ এবং যৌনতার অবদান রয়েছে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর। যেমন পুরুষদের ক্ষেত্রে নিয়মিত যৌনজীবন প্রস্টেট ক্যানসারের সম্ভাবনাকে কমায় তেমনি নারীর জন্য অর্গাজম...
★★ নিয়মিত যৌনজীবন এবং ঘন ঘন অর্গাজম বা চরম তৃপ্তি মেনোপজ ত্বরান্বিত হতে বাধা দেয়
★★মেনোপজের পরেও নিয়মিত যৌনজীবনে সাহায্য করে।
★★ মেনোপজের ফলে মেয়েদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে যৌনাঙ্গে ফ্লুইডের পরিমাণ কমে যেতে থাকে যাকে বলে ভ্যাজাইনাল অ্যাট্রোফি বা ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেস। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে যে সমস্ত মহিলারা মেনোপজের পরেও নিয়মিত সঙ্গম করেন তাঁদের মধ্যে ভ্যাজাইনাল অ্যাট্রফির সম্ভাবনা অনেক কম।
★★মোটামুটিভাবে ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে মেনোপজ হয় বেশিরভাগ মেয়েদের। ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেসের জন্য অনেকেই এই সময় জীবন থেকে যৌনতাকে বাদ দেন। অধিকাংশ মেয়েই এর ফলে মারাত্মক ডিপ্রেশনে চলে যান।
★★কোনও মেয়েই যদি নিয়মিত যৌনজীবনে অর্গাজমের তৃপ্তি উপভোগ করেন তবে ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেসের সমস্যা সার্বিকভাবেই কম হবে এবং মেনোপজ ত্বরান্বিত হওয়াকেও আটকানো যাবে।
★★মেনোপজের পরে জেল বা লুব্রিকেটর ব্যবহার করে যৌনজীবন অক্ষুণ্ন রাখা গেলে ও শারীরিক মিলনে তৃপ্তি বজায় থাকলে ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেসের সমস্যা কমে যায় এবং ডিপ্রেশনও কেটে যায়।
★★ অর্গাজমের সঙ্গে মেয়েদের আয়ুর একটি যোগসূত্র রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ১০০০ জন মহিলার যৌনজীবন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, যাঁরা দীর্ঘদিন তৃপ্ত যৌনজীবন যাপন করেছেন, তাঁরা দীর্ঘায়ু হয়েছেন।
★★সার্বিক সুস্বাস্থের জন্য অর্গাজম দরকার কারন অর্গাজমের সময়ে মেয়েদের শরীরে ৩ রকম হরমোন নিঃসরণ হয়— অক্সিটোসিন, এনডরফিন এবং ডোপামাইন। এই তিনটি হরমোনই মানুষের জীবনের সার্বিক সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই অর্গাজম বেশি হলে মেয়েদের শরীর-স্বাস্থ্য দু’ই ভাল থাকে।
 
সঙ্গম হোক শারিরীক ও মানসিক মিলনের মাধ্যমে। বর্তমানে মেয়েরা এবং শিক্ষিত ছেলেরা এব্যাপারে অনেকটাই সহজ,,তবে সে সংখ্যা তুলনামূলক এখনো অনেক কম। প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়া গুলো নিয়ে যে ট্যাবু তা সুন্দর সহজ সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলে নিঃশেষ করে দিতে পারে। তাই এসম্পর্কে জানতে হবে পরিষ্কার ধারনা রাখতে হবে এবং কমিউনিকেটিভ হতে হবে তাতেই বরং উপকা্র হবে।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top