চুল ভালো থাকুক প্রাকৃতিক ভাবেই।

নারীকথন | প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২০ ২১:১১; আপডেট: ৬ অক্টোবর ২০২০ ২১:৩৫

ছবিঃ সুরাইয়া সম্পা

এই লকডাউন পুরোটা চলে গেল চুলের টেনশন। ঘরের টাইলস করা সাদা মেঝে যেন কালো, সর্পিলাকার এই আতংক দিয়ে ভরা। যেদিকে চোখ যায় চুলের রাজত্ব। যেন বাসা বাড়ি তাদেরই আমরা হলাম আশ্রিত। চুলের এত শত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ ছেলে বুড়ো সবারই। সেই কথা আমলে নিয়ে চুলের যত্নে যে ১৪ টি উপকরণ জীবন রক্ষাকারী সেগুলা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন-

গরম তেল
চুলের খাবার এক কথায় বলা হয় তেলকে। চুল বাড়তে, উজ্জ্বল হতে, সুন্দর হতে যা যা দরকার তার সবকিছুর একটি সহজ সমাধান তেল। মা ঠাকুমার ছোটবেলার ঘরোয়া যত্ন মনে পড়ে ? ঠিক ধরেছেন ,চুলে গরম তেল চুলের গোড়া মজবুত করে, ড্যানড্রাফ তাড়ায়,চুলের প্রোটিন যোগায় যা চুল বৃদ্ধি তে সাহায্য করে। এই হট ওয়েল মাসাজ করতে বাসায় নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন তেল। বাহ ব্যবহার করতে পারেন বাজারের এক্সট্রা ভার্জিন নারিকেল,জলপাই এর তেল। সাথে যোগ করতে পারেন ক্যাস্টর,ভৃঙ্গরাজ তেল।

মেথি
মেথিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও নিকোটিনিক এসিড রয়েছে যা চুলকে ভেতর থেকে পুষ্টি যোগায় এবং চুলকে মজবুত করে।এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে লেসিথিন রয়েছে যা চুলের গোড়ায় পুষ্টি যোগায় এবং চুলের বৃদ্ধিতে ও চুল গজাতে কার্যকরী।

কালোজিরাঃ
কালোজিরা নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। মাথায় কালোজিরার তেল ব্যবহার করা আর খাবারে কালোজিরা ব্যবহার খুব ভালো ফল দেয়।কালোজিরার তেল চুলের ফলিকলকে ভাইব্রেট করে ও শক্তিশালী করে যার ফলে নতুন চুল সৃষ্টি হয়। এছাড়াও কালোজিরার তেল চুলের গোড়া শক্ত করে ও চুল পড়া কমায়। চুলের দৈর্ঘ্য বাড়াতেও এই তেল উপকারে আসে।

মেহেদি পাতা
এ ভেষজ উপাদান চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি চুলে নিয়ে আসে ঝলমলে ভাব। মেহেদির ভেষজ গুণ চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। ২ মুঠো তাজা মেহেদি পাতা অল্প পানি দিয়ে বেটে নিন। আপনি চাইলে এর সাথে নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল যোগ করতে পারেন। মেহেদি প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার করে চুল তাই মেহেদি লাগানোর পর আলাদা করে শ্যাম্পু করার দরকার হয়না ।মেহেদি চুলের আদর্শ খাদ্য। এটি চুলকে ভেতর থেকে মজবুত করে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।

ভাতের মাড়
বাঙালিদের প্রধান খাদ্য ভাত হলেও অনেকে ডায়েটের কারণে ভাতের থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু জানেন কি? ত্বক আর চুলের স্বাস্থ্য ফেরাতেও ভাতের মাড়ের জুড়ি নেই। অবাক হলেন ? চিনের প্রাচীন ঘরোয়া এই প্রথায় ভাতের ফ্যান দিয়ে শ্যাম্পু করে থাকেন, ওখানে ওঁরা বিশ্বাস করেন এতে চুলের সুস্বাস্থ্য দীর্ঘদিন বজায় থাকে,চুলের প্রোটিন বৃদ্ধি হয় আর চুল দীর্ঘদিন কালো থাকে অর্থাৎ পাক ধরেনা । ভাতের ফ্যানে কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ ইনোসিটল থাকে যা চুলের ঘর্ষণকে হ্রাস করে গোড়া থেকে শক্তিশালী করে তোলে। এছাড়া এতে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যার কারণে চুল চকচকে করে তোলে। এর পাশাপাশি নমনীয়ও হয়ে ওঠে।

আমলকী
আমলকী শুধু চুল পড়া কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয় না। এন্টি-ব্যাক্টেরিয়াল গুনাগুন থাকায় খুশকির মত বিরক্তিকর সমস্যাকে সহজেই দূর করতে পারে আমলকী। চুল পেকে যাওয়া রোধ করে আমলকির তেল। চুলের আগা ফেটে যাওয়া, পেকে যাওয়া প্রতিরোধে আমলকি ভীষণ কার্যকরী । এছাড়া আমলকিতে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণাগুণ থাকে যা চুলে খুশকি, উঁকুনের মতো একাধিক সমস্যাররোধ করে। চুলকে হেলদি ও মজবুত করে এবং কন্ডিশনিং করে। যদি রোজ একটা আমলকী খাওয়া যায়, তাহলে চুলের সাথে সাথে শরীরও থাকবে হেলদি।

ডিম
এতে মূলত আছে প্রোটিন, যেমন বায়োটিন, ফলেট। আছে ভিটামিন এ,বি, ডি এবং ই।
ভিটামিন মূলত চুলের ড্যামেজ থেকে চুলকে রক্ষা করে।ভিটামিন B ,B1 (থিয়ামিন),B2 (রিভফ্লাবিন),এবং B5 (প্যান্টোথেনিক ) থাকায় চুলের পুষ্টি আর অকালপক্কতা রোধ করে ।চুলকে শুষ্ক হওয়া থেকে আটকায় আর চুলের ময়েশ্চার ধরে রাখে। আর বায়োটিন, ফলেট চুলের বৃদ্ধির জন্য খুবই দরকারী। আয়রন কোষের জন্ম দিতে সাহায্য করে। সে ক্ষেত্রে ডিমে থাকা আয়রন কিন্তু স্ক্যাল্পে কোষের জন্ম দেয়।

পেঁয়াজের রস
চুলের যত্নে দারুন উপকারী এই উপাদান সম্পর্কে জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, স্ক্যাল্পের মধ্যে পেঁয়াজের রস লাগালে চুল পুনরায় গজাতে সাহায্য হয়। যাদের অ্যালোপেসিয়া অ্যারিয়াটা রয়েছে এমন মানুষের মধ্যে গবেষণাটি করা হয়। গবেষকরা দেখেন, পেঁয়াজের রস দিনে দুবার করে টানা দুই সপ্তাহ ব্যবহারের পর চুল পুনরায় গজানো শুরু হয়েছে।এর আন্টি ব্যাকটেরিয়াল আর আইনটি ফাংগাল উপাদানের জন্য চুল ইনফেকশন মুক্ত থাকে এবং চুল ভেঙে যাওয়া রোধ করে ।

নিম
চুল থেকে ত্বক সবকিছুকেই হেলদি রাখতে, নিমের ব্যবহার বহু বছর ধরে হয়ে আসছে। এটা চুলকে হেলদি তো রাখেই, তার সাথে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল রূপে কাজ করে, যেটা খুশকি, স্ক্যাল্পের অন্যান্য সমস্যা যেমন চুলকানি, ফুসকুড়ি এসব কমায়, এমনকি উকুনও।

শিকাকাই
স্ক্যাল্পে আরাম যোগায় শিকাকাই। স্ক্যাল্পে কোনও চুলকানি হলে সেটা দূর করে একটা ঠাণ্ডা পরশ যোগায়।খুসকি তাড়াতেও কাজ দেয় এই শিকাকাই। কারণ এতে আছে অ্যান্টি ফাঙ্গাল উপাদান।
শিকাকাইতে (Shikakai) আছে অসংখ্য ভিটামিন যা হেয়ার ফলিকলে পুষ্টি যোগায় এবং স্ক্যাল্পে কোলাজেন বৃদ্ধি করে চুলের বৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করে।অকালপক্কতা রোধ করে শিকাকাই। এমনিতে চুলের যে স্বাভাবিক সাদা হওয়া সেটাও অনেকটাই রোধ করে এবং চুল অকালে পেকে যাওয়াও প্রতিরোধ করে।শিকাকাইয়ের (Shikakai) আরও একটি প্রধান কাজ হল চুলের হারিয়ে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনা। চুলে জট পড়লে সেটাকে দূর করে চুলে স্মুদনেস বা কোমলতা আনতেও সক্ষম শিকাকাই।

রিঠা
ঘন ও মজবুত চুল পেতে রিঠার জুড়ি নেই।চুল পরিষ্কার করতেও সাহায্য করে রিঠা। কারণ, এতে সাবানের মতো একটি পদার্থ আছে। যেই কারণে একে Soapnut বলা হয়।এতে আছে ভিটামিন এ, ডি, কে আর ই। এই ভিটামিনগুলি চুল উজ্জ্বল ও নরম করে।স্ক্যাল্পে কোনও সংক্রমণ হলে বা উকুন তাড়াতেও রিঠা কাজ দেয়।এছাড়াও রিঠা খুসকি দূর করে এবং জট ছাড়াতেও কাজ দেয়।

এলোভেরা বা ঘৃতকুমারী
ত্বকের পাশাপাশি চুলের জন্য অ্যালোভেরা অনেক উপকারি৷ অ্যালোভেরার ব্যবহারে মাথার ত্বকের পি এইচ ঠিক থাকে আর খুশকিও দূর হয়৷

২:১ অনুপাতে এলোভেরা জেল আর ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে মাথার ত্বকে লাগিয়ে সারা রাত রেখে সকালে শ্যাম্পু করতে হবে৷ চুল খুশকি মুক্ত থাকবে৷

আদা
আদাতে থাকা জিঞ্জারল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মাথার ত্বককে প্রভাবিত করে এবং চুলের কোষ ক্ষতিকারক উন্মুক্ত রেডিকেলের বিরুদ্ধে কাজ করে চুল পাতলা হওয়া অর্থাৎ পড়ে যাওয়া কমায়।এর কন্ডিশনিং উপাদান চুল আর্দ্র রাখে ও কিউটিকেল মসৃণ করে রুক্ষতা ও কোঁকড়াভাব দূর করে মোহনীয়ভাব ফুটিয়ে তোলে।

জবা
চুলের বৃদ্ধি, খুশকি তাড়ানো, চুল কালো করা, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল-ঝলমল চুলের জন্য জবা ফুলের তেল (Hibiscus Oil) খুবই উপকারী। কারণ জবা ফুলের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-এ আর সি। যা স্ক্যাল্পের বিভিন্ন সমস্যায় দারুণ কাজ দেয়।

চুলের জেল্লা ধরে রাখতে হলে বাইরের মতো যত্ন নিতে হবে ভিতর থেকেও। ডায়েটে অন্য যা-ই থাকুক না কেন, রাখতেই হবে ১২ থেকে ১৪ গ্লাস জল। চুল ভাল রাখার প্রথম শর্ত এটাই।

লেখাঃ সুরাইয়া সম্পা, ইডেন মহিলা কলেজ।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top